প্রথম কথা হচ্ছে, শিল্পী বা সংস্কৃতিকর্মীদের তো লেজুড়বৃত্তি করার কথা নয়। কোনো ব্যক্তি বা দলের লেজুড় হওয়া তার কাজ নয় কোনোভাবেই। বরং বলা যায়, এটাই কোনো শিল্পীর জন্য প্রথম ও মৌলিক ডিসকোয়ালিফিকেশন। কারণ শিল্প বলতে বুঝি এমন এক ধরনের সৃজনশীল চর্চা, যা গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে নতুন কোনো অর্থ বা ব্যঞ্জনা তৈরি করতে চায়। আর সেই অর্থ বা ব্যঞ্জনাগুলো ঐতিহাসিকভাবেই মূলত ক্ষমতাশালী মানুষদের বিপক্ষে দাঁড়িয়েই নির্মিত হয়েছে।
যদি আমরা শিল্প ও সংস্কৃতির উৎসর দিকে তাকাই, একেবারে মানব ইতিহাসের শুরুতে, গুহামানবদের যুগে; দেখি, তারা শিকারের প্রয়োজন থেকেই গুহার দেয়ালে ছবি এঁকেছে। এই ছবি আঁকা ছিল এক ধরনের পরিকল্পনা, যার মহড়া বা চর্চা থেকে এসেছে কৃত্যমূলক পরিবেশনা, যা আমাদের থিয়েটারের আদি রূপ বলে বিবেচিত। এখান থেকেই চিত্রকলার সূচনা এবং থিয়েটার বা পারফরমিং আর্টের ধারণা পাই। অর্থাৎ শিল্প কখনোই জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় হিসেবে শুরু হয়নি, কিংবা শুধু বিনোদনের জন্য তৈরি হয়নি। সামাজিক ইতিহাসের দিক থেকে দেখলে বোঝা যায়, মানুষ যত বেশি সামাজিক হয়েছে, সমাজ যত জটিল হয়েছে, ততই এই কৃত্যমূলক পরিবেশনাগুলো দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবে বিকশিত হয়েছে।
পরবর্তীকালে মানবসমাজ যখন জটিলতর হয়েছে, বিশেষ করে যখন উদ্বৃত্তের ধারণা এসেছে; তখনই শিল্প, কবিতা, গান ও পরিবেশনাগুলো ধীরে ধীরে আলাদা একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে। তবে উদ্যান কৃষিভিত্তিক সমাজগুলোতেও আমরা দেখি, জীবনের সঙ্গে শিল্পের নিবিড় সম্পর্ক। উদ্যান কৃষিভিত্তিক সমাজে চাষাবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত গান, জুম চাষের সময় গাছ পোড়ানোর ঐতিহ্য—এসবই শিল্পের আদিম
রূপ। জীবনের জৈবিক প্রয়োজন থেকেই ধীরে ধীরে শিল্প বিকশিত হয়েছে।
কিন্তু কৃষি সভ্যতায় উদ্বৃত্ত তৈরি হওয়ার পর আমরা দেখি, জীবন ও সংস্কৃতির সংযোগ থেকে শিল্প কিছুটা আলাদা একটি পরিসরে চলে যায়। একটি শ্রেণি তৈরি হয়, যারা দৈনন্দিন জীবিকার বাইরে গিয়ে শিল্প চর্চা করতে পারে, যা আগে অসম্ভব ছিল। কারণ উদ্বৃত্ত না থাকলে মানুষকে সর্বোচ্চ সময় বেঁচে থাকার জন্য দুষ্প্রাপ্য খাদ্য সংগ্রহেই ব্যয় করতে হতো।
আমরা দেখি, প্রকৃতির শক্তিগুলো—বৃষ্টি, বাতাস, বজ্র, সাগর উপাসনার বিষয় হয়ে ওঠে। উপাসনার অংশ হিসেবেই গান, নৃত্য ও বিভিন্ন পরিবেশনা ব্যবহৃত হতে থাকে। মানুষ যেসব অতিপ্রাকৃত শক্তিকে ব্যাখ্যা করতে পারেনি, সেগুলোর প্রতি সমর্পণের ভাষা হয়ে ওঠে নানা পরিবেশনা। পরে উন্নত কৃষি সমাজে এসে, যেখানে স্রষ্টা ও রাজাকে অনেক সময় সমার্থক হিসেবে দেখা হতো, সেখানে ঈশ্বরের গুণকীর্তনের পাশাপাশি রাজা বা ক্ষমতাশালীদের গুণকীর্তনও যুক্ত হয়। এভাবেই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক ঘরানা তৈরি হয়।
তবে শিল্প বিপ্লবের পর আমরা দেখি, শিল্পে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ, চাওয়া-পাওয়া ও অনুভূতিগুলো গুরুত্ব পেতে শুরু করে। তার আগে মানবিক কনটেন্টকে অনেক সময় ভালগার বা অশ্লীল বলে চিহ্নিত করা হতো, কারণ শিল্পকে তখন এক ধরনের মহিমান্বিত ও দূরবর্তী বিষয় হিসেবে ভাবা হতো। আজকের কনটেম্পোরারি শিল্পচর্চায় আমরা দুটি ধারা দেখি—একটি ধারা মনে করে শিল্প শুধু শিল্পের জন্য, মানুষের মনন ও মেধার উৎকর্ষের জন্য। আরেকটি ধারা মনে করে, শিল্পকে সব সময় ক্ষমতাশালীদের বয়ানের বিপক্ষে দাঁড়াতে হবে, প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে হবে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে দ্বিতীয় ধারার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত মনে করি। আমার কাছে শিল্পের মূল কাজই হলো ক্ষমতা সম্পর্ককে প্রশ্নের মুখে রাখা—যে ক্ষমতা মানুষকে, প্রকৃতিকে কিংবা বিভিন্ন জাতিসত্তাকে প্রান্তিক করে। এই জায়গা থেকে দাঁড়ালে লেজুড়বৃত্তির কোনো সুযোগই থাকার কথা নয়। কিন্তু ইতিহাসে আমরা দেখেছি, শিল্পীরা তা করেছেন। শিল্পকে ওপরে ওঠার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রাজানুগ্রহ পাওয়ার জন্য শিল্পীরা রাজাদের প্রশস্তি লিখেছেন।
ফেরদৌসির ‘শাহনামা’র ক্ষেত্রেই আমরা দেখি, ফেরদৌসি যে কাহিনি লিখেছেন, সেগুলো ইসলামের বহু আগের পারস্য ও সুমেরীয় সভ্যতার ইতিহাস। রাজাকে খুশি করার তাগিদ থাকলেও তিনি রাজা বা ইসলামের প্রচার করেননি, বরং প্রাচীন ঐতিহ্যকেই তুলে ধরেছেন। এখানেই শিল্পের সাবভারসিভ চরিত্রটি ধরা পড়ে, বাইরে থেকে রাজানুগত মনে হলেও ভেতরে ভেতরে ভিন্ন স্রোত বইতে পারে।
তবু আমার বিশ্বাস, শিল্পীদের দুর্বলের ও প্রান্তিকের পক্ষে দাঁড়ানো জরুরি। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে পৃথিবীকে আমরা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছি। এই ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে জীবনের কথা বলতে হলে শিল্পীদেরই প্রয়োজন। যারা ধ্বংস করে, তাদের পক্ষে শিল্পী লেজুড়বৃত্তি করতে পারে না, করলে সে আর শিল্পী থাকে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো শিল্পচর্চার জন্য একটি মুক্ত পরিসর তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, পরিচয়ভিত্তিক অসহিষ্ণুতা রাজনৈতিক পরিসর ছেড়ে সামাজিক পরিসরে ঢুকে পড়েছে। এখন আর প্রশ্নটা রাজনৈতিক দলের নয়; প্রশ্নটা হয়ে দাঁড়িয়েছে, ‘আমি যেমন, তোমাকেও তেমন হতে হবে।’ ভিন্নতা মানেই বাতিল।
এটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। কারণ সংস্কৃতি শুধু নাচ-গান নয়; সংস্কৃতি মানে মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও সামাজিকীকরণের পদ্ধতি। বাংলাদেশে ভিন্নতাকে অস্বীকার করার এই প্রবণতা ঐতিহাসিকভাবে ছিল না। বঙ্গ ছিল এক ধরনের গর্ত, যেখানে নানা দিক থেকে বিতাড়িত, প্রান্তিক মানুষ এসে আশ্রয় নিয়েছে। একসঙ্গে বন কেটে বসতি করেছে। এই বহুত্ববাদই ছিল আমাদের শক্তি, যার জোরে আমরা নানা শাসককে বিদায় করেছি।
আমি নিজে সত্তর-আশির দশকে বড় হয়েছি, তখন পরিচয় কখনো বন্ধুত্বের শর্ত ছিল না। আজ তা হয়ে উঠেছে। এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বৈশ্বিক ডানপন্থী রাজনীতির প্রভাব। ট্র্যাডিশনাল ভ্যালু খুঁড়ে এনে ভিন্নতাকে দমন করা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে আমাদের লোকসংস্কৃতির দিকে তাকানো জরুরি। সঙযাত্রা, পালাগান—এসব ছিল দরিদ্র কৃষকদের শিল্প, যেখানে পৃষ্ঠপোষককেই ব্যঙ্গ করা হতো। পালাগানে বিতর্কের মাধ্যমে বিশ্বাস ও প্রশ্ন উন্মুক্ত হতো। বাংলায় ইসলামের প্রসারও ঘটেছে এমন সাংস্কৃতিক বিতর্কের মধ্য দিয়ে, যেখানে প্রশ্ন করা অপরাধ ছিল না।
আজ সেই ঐতিহ্য ভেঙে পড়ছে। পালাগানের শিল্পী আবুল সরকারকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটি আমাদের সহিষ্ণুতার ইতিহাসের ওপর বড় আঘাত। রাজনৈতিক অথরিটারিয়ানিজম থেকে আমরা হয়তো বের হচ্ছি, কিন্তু সামাজিক অথরিটারিয়ানিজমে ঢুকে পড়লে বিপদ আরো বড়।
আমাদের কাওয়ালি যেমন দরকার, তেমনি পালা ও যাত্রাও দরকার—একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটিকে রাখা নয়; সহাবস্থান ও সহিষ্ণুতার ঐতিহ্যেই আমাদের টিকে থাকা জরুরি। সেই জায়গাতেই যেন আমরা থাকতে পারি—নতুন বছরে এটাই আমার আশা।
অনুলিখন : মানজুর হোছাঈন মাহি



জীবনকে ধরে রাখার যাত্রা শুরু হয়েছিল হীরালাল সেনের হাত ধরে। তখন দৃশ্য ছিল সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রকাশ। পাকিস্তান আমলে সেই দৃশ্য হয়ে ওঠে ভাষার প্রতিরোধ। স্বাধীনতার পর সিনেমা হওয়ার কথা ছিল জাতীয় কণ্ঠস্বর। কিন্তু বাস্তবে আমাদের সিনেমা কোনো দিনই শক্ত কাঠামোর ওপর দাঁড়াতে পারেনি। হল কমেছে, দর্শক সরে গেছে, বড় পর্দা তার কেন্দ্রীয়তা হারিয়েছে। ফলে বহু বছর ধরেই আমরা শুনে আসছি,
কিন্তু আমি একটু ভিন্ন হিসাব দিতে চাই
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইসরায়েল, কানাডা, জার্মানি, ফ্রান্সসহ উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায় বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এশিয়ায় চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর, জাপান, কোরিয়া, হংকং শক্তিশালী স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশও দ্রুত বিকাশমান স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে পরিণত হচ্ছে। বিকাশ ও নগদের সাফল্য দেশকে বৈশ্বিক মানচিত্রে পরিচিত করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করলেও সম্ভবনার নিরিখে অগ্রযাত্রা মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়।
দেশে স্টার্টআপ কার্যক্রমকে একটি খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর ইকোসিস্টেম। তরুণরা সমাজে বিদ্যমান মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে তাদের ব্যাবসায়িক কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু সমস্যা সমাধানের জন্য তাদের প্রয়োজন হয় টেকনোলজির। আর এই টেকনোলজি হতে পারে নতুন বা পুরনো কোনো টেকনোলজির কিছুটা পরিবর্তিত রূপ। তা ছাড়া ব্যবসার উপকরণ, পদ্ধতি বা সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে উৎপাদিত পণ্য/সেবা মানুষের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যমেও স্টার্টআপ হতে পারে। আমাদের দেশের উদোক্তারা বেশির ভাগ সময়ই বিশ্বে বিদ্যমান কোনো ব্যবসার অনুসরণে তার স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানটি দাঁড় করাতে চায়।
স্বৈরাচার পতনের পর তাদের মধ্যেই এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সচেতনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে আগামী সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে জেন-জির মধ্যে বিপুল আগ্রহ-উদ্দীপনা ও প্রত্যাশা রয়েছে। জেন-জি প্রজন্মের একজন হিসেবে আমিও আমার চিন্তা-ভাবনা তুলে ধরতে চাই।